আধুনিকতার সব ছোঁয়াই যার মধ্যে আছে, যে যুবক ফেসবুক চালায়, সিনেমা-নাটক দেখে, বন্ধুদের সঙ্গে নাচ-গানও করে, গার্লফ্রেন্ড আছে, মাঝেমধ্যে ধূমপানও করে, সে হঠাৎ করে জঙ্গি হয়ে গেল! যে ছেলেকে শুক্রবার জুমার নামাজে পাওয়া যায়নি, সেই ছেলে বেহেশতে যাওয়ার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আত্নঘাতী হয়ে উঠল!
দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে কখন কোথায় বোমা ফাটে, বলা মুশকিল। মনে হচ্ছে, আমরা যেন ইসলামবিদ্বেষী কোনো রাষ্ট্রে বসবাস করি। আর সেই ইসলামবিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে ইসলামের নামাবলি গায়ে কতিপয় দুর্বৃত্ত (অন্তত ইসলামপ্রেমী নয়) আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাচ্ছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। ওদের দুর্বলতা বিশ্বাসে। আর এই দুর্বল বিশ্বাসকে (ইমান) এক্সপ্লয়েট করে ব্যবহার করছে ইসলামের বিরুদ্ধে। ইসলাম ধ্বংস করাই যাদের লক্ষ্য, তারাই তাদের সব শক্তি দিয়ে এই বীজ বপন করে চলেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ ধর্মীয় বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সবার আগে ধর্মীয় অনুশাসন থাকে প্রাধান্যে। আর এই সুযোগটাই গ্রহণ করছে সন্ত্রাসীদের গডফাদাররা। তারা ইসলামের দোহাই দিয়ে, জান্নাতের লোভ দেখিয়ে সহজ-সরল মানুষকে এই পথে নামাচ্ছে। কুরআন-হাদিসের কোথাও মানুষকে মারা তো দূরের কথা, কষ্ট দিয়েও ধর্ম প্রচার করার কোনো দলিল বা হাদিস নেই।
একজন মানুষ সারাজীবন দেশের কিংবা দেশের বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে চাকরি নিয়ে সুন্দরভাবে তার কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকেন। ঠিক তখনই হঠাৎ তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। কেউ জানে না, তিনি কোথায় আছেন! পরে দেখা যায়, কোনো জঙ্গি কিলিং স্পটে তার মৃতদেহ পড়ে আছে। তাহলে এই যে, একজন আধুনিক শিক্ষিত মানুষ, যিনি আগে ঠিকমতো নামাজই পড়তেন না, তিনিই এখন জঙ্গি। আল্লাহকে খুশি করার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিলেন। তিনি জঙ্গি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এখানে একটি কথা আছে। ওই ব্যক্তি কি ইসলামের জন্যই জঙ্গি হলেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নিহিত ছিল? এই প্রশ্নের খোঁজ কেউ করেনি। পাঞ্জাবি ও টুপি পরা ছিল। কপালে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা ছিল। হ্যাঁ, বাহ্যিকভাবে সে যে জঙ্গি, তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও সত্য যে, ওর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই। বুঝে-না বুঝে ও কারো পক্ষে (স্ব-নির্মিত আদর্শ) উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছে।
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠতেই পারে, বোমা-গ্রেনেড ফাটিয়ে মারার যে নজির এখন দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে ইসলামের কী সম্পর্ক!
আমরা জঙ্গিবাদকে সমূলে উৎপাটন করতে চাই। আর সেই কারণেই জঙ্গি হওয়ার পেছনের কারণগুলোকে চিহ্নিত করা দরকার। অতঃপর চিহ্নিত রোগের চিকিৎসায় এগিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. পিতামাতার সঠিক তদারকির অভাব। ২. সঠিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকা। ৩. সঙ্গদোষ। ৪. অর্থলোভ। ৫. কোনো অপশক্তির চাপ। ৬. প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়া। ৭. স্বাধীনতাবিরোধী কোনো শক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। ৮. ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছোট থেকেই না থাকা। ৯. সামান্য অপরাধে ক্ষমা না পাওয়া। ১০. আলেম নামধারী কিছু দেশি এবং আন্তর্জাতিক চক্রের ভুল ব্যাখ্যা।
এই মুহূর্তে যদি জঙ্গিবাদকে সমাজ থেকে ঝেঁটিয়ে দূর করতে হয়, তাহলে ইসলামকে শুধু শুধু দোষারোপ না করে জঙ্গিবাদের মূল কারণ খুঁজে বের করার দিকে মনোযোগী হতে হবে। ইতিপূর্বে যাদেরকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদেরকে অতিসত্বর বিচারের আওতায় এনে আইন অনুযায়ী রায় দিতে হবে। এদের সঠিক বিচার হলে নতুন করে যারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চলেছে, কিছুটা হলেও তাদের হুশ ফিরবে। অন্যথায় দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এর চরম মূল্য দিতে হবে।
সুত্রঃ প্রতিদিনের সংবাদ