নারী আন্দোলনকে কেবল প্রতিরোধমূলক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে কৌশলগত হতে হবে। নারী ভোটারকে সচেতন, সংগঠিত ও দরকষাকষিতে সক্ষম রাজনৈতিক এজেন্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা, নারীবিদ্বেষী ভাষ্য ও নীতির বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং নারীর অধিকারকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অধীন করার যে কোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া। তা না হলে নারীরা বারবারই ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হবে, কিন্তু ক্ষমতার অংশীদার হবে না।
আমরা আজ একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যখন ইতিহাস ও বর্তমান মুখোমুখি। একদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে ১৯৯১ সাল থেকে প্রায় ৩০ বছরের নারী নেতৃত্ব, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল ও ব্যতিক্রমী। অন্যদিকে সেই দীর্ঘ সময়ের নারী নেতৃত্বের পরেও আমরা ২০২৬ সালে এমন একটি জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল যে সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, তা একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে মোট মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র ৪.২৪ শতাংশ নারী।
এই বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। আরও স্পষ্ট করে বললে, নারী নেতৃত্ব ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রশ্নে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতির গভীরে যে নারীবিদ্বেষী মানসিকতা রয়েছে, তারই নগ্ন প্রতিফলন আমরা আজ দেখছি।
৫১ শতাংশ নারী কেবলই ‘ভোট ব্যাংক’
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। অথচ এবারের নির্বাচনে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও অংশীজন হিসেবে নয়, বরং সংগঠিতভাবে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি ভোট ব্যাংক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। নারীরা একদিকে বাম ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধা ও গুরুত্বপূর্ণ ভোট ব্যাংক, অন্যদিকে চরম ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তু ও হুমকির মুখে থাকা একটি গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন।
বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নারীর ভোটকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও তাদের মেনিফেস্টোতে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাচল ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ‘নৈতিকতা’ ও ‘ধর্মীয় শুদ্ধতা’র নামে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা স্পষ্ট। নির্বাচনী সময়ে নারী ভোটারদের ধর্মীয় আবেগ উস্কে দেওয়া, ভিন্নমত পোষণকারী নারীকর্মী ও প্রার্থীদের সামাজিকভাবে হেয় করা; কখনও সরাসরি হুমকির মুখে ফেলা– এই সব কিছু প্রমাণ করে যে, নারীরা এখনও নাগরিক নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ভোট ব্যাংক মাত্র। এর ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের নারী আন্দোলনের অর্জন গুরুতর ঝুঁকিতে পড়ছে।
নারী কেন নিশানা
কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে ক্রমাগত অসৎ, বিকৃত, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বক্তব্য রাজনীতিকে বিষাক্ত করে তুলছে। এই চেষ্টার নেতৃত্বে রয়েছে জামায়াতের মতো কট্টরপন্থি দল। দলটির শীর্ষ নেতাসহ সব নির্বাচনী প্রার্থী নির্বিকারভাবে নারীবিদ্বেষী মিথ্যা ও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমে জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়লেও তাদের মধ্যে অনুতাপ আসা দূরের কথা, বরং নারীবিদ্বেষী ও আপত্তিকর মন্তব্য আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মিথ্যা ও উস্কানিমূলক রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশের নারীরা। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, গৃহিণী, কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, শিক্ষিত, স্বনির্ভর, রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকা– সব শ্রেণির নারীই কুৎসিত আক্রমণের শিকার। প্রথম দৃষ্টিতে এটিকে ভোটের রাজনীতির একটি কৌশল মনে হতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি একটি অপকৌশল। তবে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়; এটি তাদের রাজনৈতিক দর্শনের অংশ।
পরিবর্তনের মুখোশ ও পুরোনো চরিত্র
২০২৪-এর পাঁচ আগস্টের পর জামায়াত নানা কৌশলে নিজেদের ‘পরিবর্তিত’ দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। নারী নেতৃত্বে বিশ্বাসী, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে প্রচার চালিয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোর সহায়তা কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে লাভও ঘরে তুলেছে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার আলোচনা শুরু হতেই তাদের প্রকৃত নারীবিদ্বেষী চেহারা প্রকাশ পেতে থাকে।
নারীর কর্মঘণ্টা কমানোর হাস্যকর প্রস্তাব, শিক্ষাঙ্গন ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অবমাননাকর ভাষায় উপস্থাপন, নারীকে ঘরের চৌহদ্দিতে আটকে রাখার ধারণা– এ সবই পুরোনো আদর্শের ধারাবাহিকতা। অন্যান্য দল যেখানে ঐতিহাসিকভাবে কম নারী প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে জামায়াতের নারী প্রার্থীর সংখ্যা শূন্য। এটি তারা জেনে-বুঝেই করেছে। এমনকি তাদের জোটেও নারী প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছে।
কৌশলের রাজনীতি
জামায়াত কখনোই তার দলীয় চরিত্রের বাইরে যেতে চায়নি। বরং এই সময়ে সেই চরিত্র আরও নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতাকারী এই দলের মূল কৌশল হলো, ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা। এর অংশ হিসেবে তারা ক্ষমতাসীন শক্তির তাঁবেদারি, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণহত্যায় সহায়তা, প্রশাসন, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুগতদের অবস্থান নিশ্চিত করা এবং বিদেশি শক্তির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে গেছে।
তাই দেশীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন– ফুলবাড়ী, সুন্দরবন, রামপাল বা চট্টগ্রাম বন্দর; কোথাও জামায়াতের সক্রিয় অবস্থান দেখা যায়নি বা যায় না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়– গাজা গণহত্যা, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইউক্রেন, সুদান ইত্যাদি ইস্যুতে জামায়াতের নীরবতা তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থানকেই সুস্পষ্ট করে।
বৈশ্বিক কট্টরপন্থি এজেন্ডা
জামাতের নারীবিদ্বেষমূলক প্রচার কেবল নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখলে আমরা ভয়াবহ ভুল করব। বাস্তবে এটি একটি বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক, অর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ, যা দেশীয় প্রেক্ষাপটে সুচারুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এই এজেন্ডা কোনো একক ধর্মীয় দল বা গোষ্ঠীর সৃষ্টি নয়। এর পেছনে বৈশ্বিকভাবে সব ধরনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চরমপন্থি শক্তি সমানভাবে যুক্ত। বিভিন্ন দেশে এর রূপ একেকভাবে দেখা যায়। আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্য এশিয়া বা দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে যেটি সংখ্যাগুরুর ধর্ম, সেই ধর্ম ব্যবহারকারী রাজনৈতিক শক্তিই এটি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এদের লক্ষ্য পরিষ্কার– নারীবাদী শক্তির উত্থান ও নারীর ক্ষমতায়ন তারা চায় না। তারা চরম পুরুষতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতালোভী। নারীবাদী আন্দোলন ও নারীর সমতার লড়াইকে তারা ভয় পায়। কারণ তারা মনে করে, এটি বিশ্বের রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে দিচ্ছে এবং পুরুষ নিয়ন্ত্রিত প্রথাগত কাঠামোর বিপরীতে নারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বকেই শক্তিশালী করছে।
এই কারণে তারা নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতার লড়াইকে চূর্ণবিচূর্ণ করতে চায় এবং নারীদের আবারও অধীনস্থ শ্রেণিতে পরিণত করতে সচেষ্ট। একদিকে ধর্মের নাম ব্যবহার করে মেয়েদের চলাচল ও কাজের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে পুরুষের কর্মসংস্থান হ্রাসের কারণ দেখিয়ে সহাবস্থানের পুরুষকেও নারীর প্রতি বিদ্বেষী করে তুলছে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও নারীর অবমূল্যায়ন ও নারীবিদ্বেষী তথ্য সংযোজন করে শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জামায়াত এই এজেন্ডা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা নিতে চায় এবং প্রমাণ করতে চায়– তারা নারী ক্ষমতায়নবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। তবে এই চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে আমাদের মধ্য ও বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর বোঝাপড়া, মতামত ও সমন্বয়ের ওপর।
চটকদারি ইশতেহার, বাস্তবতার অনুপস্থিতি
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর ‘সুরক্ষা’ নিয়ে কিছু চটকদার ও আকর্ষণীয় প্রস্তাব থাকলেও সেখানে নারীর বাস্তব বৈচিত্র্যের কোনো স্বীকৃতি নেই। নারী বলতে মূলত বিবাহিত নারী, মা ও পরিবারকেন্দ্রিক এক সামাজিক সত্তাকেই বোঝানো হয়েছে। ফলে অবিবাহিত, একক, কর্মজীবী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বা পরিবারকেন্দ্রিক ভূমিকাকে অতিক্রম করে নিজের জীবন বেছে নেওয়া নারীদের অস্তিত্ব কার্যত অদৃশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘শরিয়াহ’ প্রসঙ্গের অস্পষ্ট ও কৌশলগত ব্যবহার– ইশতেহারে সরাসরি নারীর পোশাক বা চলাচল নিয়ে কিছু বলা না হলেও শরিয়াহভিত্তিক সমাজ ও নৈতিকতার কথা তুলে ধরে নারীর জীবনাচরণ, চলাফেরা ও পোশাককে এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রাখা হয়েছে। এই অস্পষ্টতাই নারীর জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কারণ রাজনীতিতে যা স্পষ্টভাবে বলা হয় না, তা প্রয়োগের সময় ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে এবং সেই ব্যাখ্যা সব সময় নারীর স্বাধীনতার বিপক্ষে যায়। এখানেই মৌলিক প্রশ্নগুলো সামনে আসে– একজন নারী কি শুধুই স্ত্রী ও মা হিসেবে রাষ্ট্রের চোখে মূল্যবান। আর নারী যদি বিয়ে না করে, সন্তান না নেয় বা পরিবারকেন্দ্রিক ভূমিকাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের জীবন বেছে নেয়, তাহলে তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে?
ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, যদি একটি দল নারীর পূর্ণ নাগরিক পরিচয় স্বীকার না করে; নারীর জীবনযাপনকে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার অধীন করে রাখে এবং নারীর অধিকারকে সমতা হিসেবে নয়, বরং ‘নৈতিকতার শর্তে’ মঞ্জুর করে, তাহলে আপামর নারী কেন সেই দলের পক্ষে যাবে?
রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার প্রশ্ন, আর যে ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়নের স্পষ্ট রূপরেখা নেই; সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা নেই এবং নারীর পরিচয়কে সীমিত ও শর্তাধীন করে রাখা হয়েছে, সে ইশতেহার নারীর জন্য রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হওয়ার কথা নয়। নারী ভোটাররা কেবল নিরাপত্তা নয়; সে চায় স্বাধীনতা, সমতা ও সম্মান; যে রাজনৈতিক ইশতেহার নারীর নাগরিকত্বকে শর্তাধীন করে এবং যে রাজনীতি নারীর জীবনকে স্বাধীনতা নয়, ব্যাখ্যার অধীন রাখতে চায়, সেখানে বাংলাদেশের নারীরা কেন জামায়াতকে ব্যালট দিয়ে বয়কট করবে না?
‘ভোট ব্যাংক’ নারীর ভবিষ্যৎ লড়াই
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো যেমন তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে সরবে-নীরবে নারীবিদ্বেষী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে, তেমনি বামপন্থি ও নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করা উদারপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতিও এখানে গভীর আত্মসমালোচনার জায়গা রয়েছে। বাস্তবতা হলো, নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীবাদী সমতার লড়াইকে তারা খুব কমই মূলধারার রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে; বরং নারী ভোটারকে দীর্ঘদিন ধরে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক এজেন্সি হিসেবে নয়, সহায়ক বা নৈতিক সমর্থনের প্রতীক হিসেবেই দেখে এসেছে। এর ফলে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা তাদের কাছে প্রায়ই স্বল্পমেয়াদি প্রতিবাদ বা সংকটকালীন প্রতিক্রিয়ার বিষয় হয়ে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী ভাষ্য বা ক্ষমতার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হয়ে ওঠে না। কট্টর বামপন্থিদের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট, যেখানে শ্রেণি রাজনীতির আড়ালে নারীর সমতা, শরীর ও অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো ধারাবাহিকভাবে গৌণ করে রাখা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নারী আন্দোলন ও নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও নতুন করে পর্যালোচনা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে এসব সংগঠন আইনি সংস্কার, সেবা প্রদান, সক্ষমতা উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নারী ভোটারকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয় হিসেবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এগোতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রেই আন্দোলন ও সংগঠনগুলো প্রকল্পনির্ভরতা, দাতা-এজেন্ডা বা নীতি-আলোচনার সীমিত পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ থেকে গেছে। যার ফলে নির্বাচনী রাজনীতি, দলীয় ইশতেহার, ক্ষমতা বণ্টন ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর প্রশ্নকে কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়নি। এর সুযোগ নিয়েই ধর্মভিত্তিক ও চরম ডানপন্থি শক্তি নারীদের ধর্মীয় পরিচয়ের নামে বিভাজন, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ব্যাকল্যাশ মোকাবিলা করতে হলে নারী আন্দোলনকে কেবল প্রতিরোধমূলক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে কৌশলগত হতে হবে। নারী ভোটারকে সচেতন, সংগঠিত ও দরকষাকষিতে সক্ষম রাজনৈতিক এজেন্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা; নারীবিদ্বেষী ভাষ্য ও নীতির বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং নারীর অধিকারকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অধীন করার যে কোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া। তা না হলে নারীরা বারবারই ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হবে, কিন্তু ক্ষমতার অংশীদার হবে না এবং সেই শূন্যতাই চরমপন্থি রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়ে থেকে যাবে।
সুত্রঃ সমকাল
