দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জঙ্গি নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গেছে। গোয়েন্দারা জেনেছে, জঙ্গিরা সম্প্রতি বাগেরহাটের ফকিরহাটে সংশ্লিষ্টদের অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়েছে। গত সপ্তাহে যশোরে জঙ্গি নেটওয়ার্কের এক সদস্যের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১০টি গ্রেনেডসহ বিপুলসংখ্যক অস্ত্র। রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সক্রিয় জঙ্গিচক্রের খোঁজ মেলে। গোয়েন্দারা জেনেছে, জঙ্গিচক্রটিতে জড়িতদের বেশিরভাগই একে অন্যের আত্মীয়। নির্বাচনের আগে এই খবর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ইন্সপেক্টর সাইদুর রহমান বলেন, ‘২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় রাসায়নিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে জনৈক আবদুর রহমানকে গত ৩০ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করেছে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট। জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পরদিন ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত যশোরের বাঘারপাড়ার দড়িআগড়া গ্রামে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে রায়হান উদ্দীনের বাড়ির টিনশেডের ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখা ১০টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৪টি পিস্তল, ৩৯ রাউন্ড গুলি, ৭৪টি চকলেট বোম, ওয়াকিটকি, সিসি ক্যামেরা, ধারালো অস্ত্রসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। রায়হান উদ্দীন ছিলেন হাফিজ ইব্রাহিম ওরফে গাজী ইব্রাহিম ওরফে মোস্তাকের ট্রাকচালক। তিনি যশোরের মনিরামপুরের পাড়িয়ালি গ্রামের বাসিন্দা।’
যশোরের বাঘারপাড়া থানার এসআই প্রসেনজিৎ কুমার ম-ল দড়িআগড়া গ্রামের অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, রায়হান উদ্দীন দীর্ঘদিন ধরে হাফিজ ইব্রাহিম ওরফে গাজী ইব্রাহিম ওরফে মোস্তাকের ট্রাকচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গোয়েন্দারা জেনেছে, মোস্তাক, শেখ আল-আমিন ও আবদুর রহমান এবং আরও কয়েকজন বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট থানার সাতবাড়িয়া গ্রামে স্থানীয়দের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে গোপন সভা করেন। পিস্তল ব্যবহার করে কয়েকজনকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, মামলার পলাতক আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন পারস্পারিক যোগসাজশে জব্দ তালিকাভুক্ত বিস্ফোরক ও অস্ত্রশস্ত্র রায়হান উদ্দীনের বাড়িতে মজুদ করে রাখে। ঘটনাস্থলেই সেনাবাহিনীর বম্ব নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট গ্রেনেডগুলোকে ধ্বংস করে। এগুলো ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘিœত করা, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, হত্যাকা- বা গুরুতর সহিংসতা চালানোর পরিকল্পনা ছিল জঙ্গি এবং সংশ্লিষ্টদের।
পুরনো মামলার যোগসূত্র : যশোরের বাঘারপাড়ায় উদ্ধার হওয়া গ্রেনেড ও অস্ত্রবিষয়ক মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসামিদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাস, অস্ত্র ও নাশকতার একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ অতীতে উগ্রবাদী কর্মকা-ে জড়িত ছিল এবং তারা অন্যদের অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়েছে। যশোরের মনিরামপুরের পাড়িয়ালি গ্রামের বাসিন্দা মামলার দুই নম্বর আসামি হাফিজ ইব্রাহিম ওরফে গাজী ইব্রাহিম। তার নামে ঢাকার মিরপুর থানায় ২০১৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০১৮ সালে ডিএমপির রামপুরা, কদমতলী ও কোতোয়ালি থানায় বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে। পলাতক তিন নাম্বার আসামি আল-আমিন শেখের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। তিনি একটি নিষিদ্ধঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকার ‘উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায়’ বিস্ফোরণ ঘটে। মাদ্রাসাটির পরিচালক আল-আমিন। বিস্ফোরণের পর থেকে তিনি পলাতক। ঘটনার পর আল-আমিনের স্ত্রীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর আবদুর রহমানকে গত ৩০ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যশোরের বাঘারপাড়া থেকে ১০টি গ্রেনেডসহ বিপুলসংখ্যক অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করা হয়।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় আটক আবদুর রহমানের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার গোপালপুরে। তিনি নুরুল ইসলাম মোল্লার ছেলে। তার দেওয়া তথ্যে বাঘারপাড়ার রায়হান উদ্দীনের বাড়ি থেকে গ্রেনেডসহ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। মামলায় রায়হান এক নম্বর আসামি। দুই নম্বর আসামি হাফিজ ইব্রাহিম। হাফিজ ইব্রাহিমের ভাই এবং রায়হান সম্পর্কে ভায়রা ভাই। আর আবদুর রহমানের জামাতা হাফিজ ইব্রাহিম। তিনি যশোরের মনিরামপুরের পাড়িয়ালি গ্রামের আবদুল আজিজ গাজীর ছেলে। আল-আমিন শেখের বাড়ি বাগেরহাটের মোল্লারহাটের সরুলিয়ায়। তিনিও তাদের আত্মীয়। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ইন্সপেক্টর ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাইদুর রহমান এ কথা জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর আতঙ্ক : ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাতে অভিযান শেষে পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি বাঘারপাড়া থানায় মামলা করা হয়। দড়িআগড়া গ্রামের বাসিন্দা রাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এত অস্ত্র আমাদের এলাকায় ছিল ভাবতেই ভয় লাগছে। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।’
সুত্রঃ দেশ রূপান্তর
