তালেবান শেকলে বন্দি আফগান নারীদের জীবন। দিন দিন আরও কঠিন হচ্ছে পরিস্থিতি। কট্টরপন্থিদের রোষানলে এবার চাকরি হারাবে নারী শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও। এমনটাই সতর্ক করেছে ইউনিসেফ। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী-২০৩০ সালের মধ্যে আরও ২৫,০০০ হাজারেরও বেশি নারী স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও শিক্ষিকা হারাবে আফগানিস্তান। ইউনিসেফের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় ১০ লাখের বেশি নারী বর্তমানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন না। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে চাকরি করার সুযোগও। এই অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে দ্বিগুণেরও বেশি। মঙ্গলবার দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
উচ্চশিক্ষা বন্ধের ফলে সুযোগ হারানো এক নারী বলেন, ‘আমি মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম। স্বপ্ন ছিল আমাদের গ্রামের প্রথম নারী ডাক্তার হব। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে আর পড়াশোনা করতে পারছি না। মাঝে মধ্যে মনে হয় যে, আমার ডানা কেটে শিকল পরিয়ে রেখেছে। তবে আমিও হাল ছাড়ব না।’ আশাবাদী স্বরে তিনি জানান, গ্রামের প্রায় ২০ জন শিশু ও নারীকে তিনি পড়াশোনা করতে সহায়তা করছেন। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল জানান, ‘আফগানিস্তান এক দারুণ সম্ভাবনাময় নারী প্রজন্ম হারাতে যাচ্ছে। তাদের এই নিষেধাজ্ঞা আইনের ফলে দেশটিতে নতুন নারী শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, ধাত্রী, প্রভৃতি সেক্টরে লোকবল কমে যাছে যা সত্যি হতাশাজনক। এই কর্মীরা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার সুযোগের অভাবে এদের সঙ্গে এখন দেশের ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে।’ ইউনিসেফ এর তথ্য অনুযায়ী, নারীদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ায় আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে এক বিশাল আঘাত হেনেছে। দেশটি প্রায় ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এর ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পেনশন থেকেও বঞ্চিত নারীরা: তালেবান শাসনে নিজেদের পাওনা অধিকারটুকু খুঁজতে গেলে তিরষ্কারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নারীদের। তালেবান কট্টরপন্থিরা আফগান নারীদের পেনশন থেকেও বঞ্চিত করছে। ফলে পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেকে। তালেবান শাসনের আগে প্রশাসনে কাজ করতেন নাজিফা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থ-পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত ছিলেন তিনি। কিন্তু তালেবান সরকার ক্ষমতায় বসবার পরে বন্ধ হয়ে যায় তার পেনশন। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পেনশনের টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না নিজের। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে নাজিফা জানান, ‘দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে আমি আফগান সরকারের হয়ে কাজ করেছি। কিন্তু বিগত কিছু বছর ধরে আমার পেনশনের টাকা আসছে না। আমার অসুস্থ স্বামীও অবসরগ্রহণ করেছেন। তার পক্ষেও পরিবারের হাল ধরা সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, পরিবারে তার আরও দুইটি ছেলে মেয়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় আজ তারাও ভয়ানক অসুস্থ।
এদিকে ডাক্তাররা বলেছেন, তার হাতের দ্রুত চিকিৎসা না করালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। নাজিফার মতো এভাবে পেনশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত আছে আফগানিস্তানের অসংখ্য পরিবার। এভাবে চললে, আর কিছুদিন পরে তাদের বেঁচে থাকাটাই কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে একজন বলেন, ‘এটা আমাদের মাতৃভূমি। দীর্ঘদিন দেশের পক্ষে আমরা কাজ করেছি। এখন দেশ যদি আমাদের খেয়াল না রাখে তাহলে আমরা কোথায় যাব? নিজের সর্বশেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে আজ আমরা নিঃস্ব।’ উল্লেখ্য, ২০২১ সালে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিও এর সাহায্য। যার ফলে দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে সরকারি কর্মচারীদের নানা সুযোগ-সুবিধা। বারবার, নিজের হক আদায়ের জন্য উকিল নোটিশ পর্যন্ত পাঠাচ্ছেন তারা। কিন্তু তবুও কোনো লাভ হচ্ছে না।
সুত্র: যুগান্তর
