বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষ ও আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কারাগারে আটক থাকা ৩৩৮ জন ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন৷
এছাড়া জেল পালানো তিনজন জঙ্গি নেতাকেও ধরা যায়নি৷ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনিদিষ্ট তথ্য না থাকলেও অন্তত ২৭ জঙ্গি নরসিংদী কারাগার ভেঙে পালিয়ে গেছেন, তাদেরও ধরা যায়নি৷
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর ডান পন্থার যে উত্থান ঘটেছে সেটা তো বলাই যায়৷ যেমন ধরেন যারা কারাগার থেকে বের হয়েছে, তাদের তো কেউ মোটিভেট করেনি যে এই রাস্তা থেকে বের হতে হবে৷ ফলে তারা যে আদর্শ নিয়ে ছিল, সেই আদর্শ নিয়েই আছে৷ ফলে তারা সুযোগ পেলে তৎপরতা চালাবে সেটা তো বলাই যায়৷ আবার সম্প্রতি কিছু তৎপরতাও তো আমরা দেখছি৷’’
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়৷ এছাড়া নতুন করে আলোচনায় এসেছে একসময় বাংলাদেশে আলোচিত ও নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কার্যক্রম৷ নব্য জেএমবির একটি চক্রের বিষয়ে নতুন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী৷
গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি ইউনিট৷ সেখান থেকে একটি সন্দেহজনক প্রেশার কুকার বা ‘কেটলি বোমা’ এবং বিপুল পরিমাণ গান পাউডারসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়৷
গত ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণ ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ৷
২৪ জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ছাতার ভেতরে রাখা বোমাও উদ্ধার করে পুলিশ৷
গত জানুয়ারিতে ঢাকার কেরাণীগঞ্জে একটি মাদ্রাসা এবং শরিয়তপুরের জাজিরায় ককটেল বানানোর সময় বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটে৷ ঢাকার কেরাণীগঞ্জে মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় জঙ্গিবাদ মামলার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে আসে৷ এই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট ঘটনার তদন্ত করছে৷
‘৫ আগস্টের পর ডান পন্থার যে উত্থান ঘটেছে সেটা তো বলাই যায়’
এসব ঘটনাক্রমের মধ্যেই কদিন আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কা থেকে সারা দেশে সতর্কতা জারি করে বার্তা দিয়েছিল বাংলাদেশের পুলিশ সদরদপ্তর৷
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট বা সিটিটিসির প্রধান ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে আমরা খোঁজ খবর রাখছি৷ যারা জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেছে তাদের বিষয়ে আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি৷’’
হঠাৎ আলোচনায় আল কায়দা
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’ এর ১০ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে (https://docs.un.org/en/S/2026/651) আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস নিয়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ এই প্রতিবেদনে মূলত বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের বর্তমান অবস্থা, আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং নিরাপত্তা হুমকি বিশ্লেষণ করা হয়৷ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা তথ্য, মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবছর বা নির্দিষ্ট সময় পরপর এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়৷
৩০ পৃষ্ঠা এই প্রতিবেদনের ১৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস – যা কোনো তালিকাভুক্ত সংগঠন নয়) একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে; তারা বড় কোনো ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ‘সেল’ বা শাখার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করার পাশাপাশি নিজস্ব লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে৷ ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় চালানো হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে একিউআইএস-এর ওপরই বর্তানো হয়েছিল৷ বাংলাদেশে নিজেদের শাখা বা ‘সেল’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশটির পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর বিষয়ে একিউআইএস-এর তৎপরতা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগও দেখা দিয়েছিল৷’’
এই প্রতিবেদনটি সরকার আমলে নিচ্ছে কি না জানতে চাইলে সোমবার তিনি বলেন, ‘‘অনুমাননির্ভর কোনো রিপোর্টের ওপর আমরা নির্ভর করতে পারি না৷’’
সুত্র: ডয়েচ ভেল
