ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘর্ষ এবং তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হাজার হাজার শিশু শিক্ষা বাদ দিয়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। সংঘাতের ফলে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
এই সংকটে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া একজন শিক্ষার্থী ১৩ বছর বয়সী কিশোর মুনির ফারির। কিছুদিন আগেও অন্যরকম ছিল। সে প্রতিদিন সকালে স্কুলে যেত এবং বিকেলে তার কৃষক বাবাকে গবাদি পশুর যত্ন নিতে সাহায্য করত। পড়াশোনা নিয়ে মুনির খুবই সিরিয়াস ছিল।
কৃষক পরিবারে জন্ম মনির শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল।
নতুন করে ইয়েমেনে দুই গোষ্ঠীর সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব মুনিরের মতো আরো অনেক শিশুর ভাগ্যে এসে পড়ে। দেশটির তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজেয়াহ জেলায় মুনিরদের গ্রামের কাছাকাছি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই মুনিরের পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হতে শুরু করে।
স্কুলের ক্লাসরুমে বসেই তারা দূর থেকে আসা তীব্র বিস্ফোরণ এবং গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। হঠাৎ করেই তাদের বাড়িটি ইরান-সমর্থিত হুতি এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর যুদ্ধের একদম মুখোমুখি সীমান্তে পরিণত হয়।
মুনির জানায়, তারা আশেপাশের এলাকায় যুদ্ধ চলার কথা শুনলেও এটি এত দ্রুত তাদের গ্রামে চলে আসবে তা ভাবেনি। সংঘর্ষের শব্দ গ্রামের একদম কাছে চলে আসায় তারা প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা তাদের গবাদি পশু এবং জরুরি জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে খুব ভোরেই নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় পালিয়ে যায়।
সে এবং তার পরিবার দক্ষিণ-পশ্চিম তাইজ জেলার আল-শিমায়াতিন এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য তৈরি একটি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। সেখানে পৌঁছানোর সময় তাদের কাছে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না, এমনকি বেঁচে থাকার মতো মৌলিক জিনিসপত্রও ছিল না।
গত সেপ্টেম্বর মাসে ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের কারণে যে ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। মুনির ও তার পরিবার তাদেরই অংশ। হুতিরা নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার পর খুব দ্রুত দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয় এবং লোহিত সাগর উপকূলের শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
হুতিদের এই অভিযানের ফলে ইয়েমেনে গত কয়েক বছর ধরে চলা শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনগুলো মোটামুটি শান্ত ও স্থিতিশীল ছিল।
হুতিরা এখন তাইজ শহরের উপকণ্ঠে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা এবং যোগাযোগের রাস্তাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সরকারি বাহিনী ও সৌদি আরবের বিমান হামলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। এই লড়াই, বিমান হামলা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
মুনির এবং তার ভাই এখন পড়াশোনা করার বদলে তাদের ক্যাম্পের বাইরের বাজারে মোজা এবং অন্যান্য সস্তা জিনিসপত্র বিক্রি করে। তার ক্লাসরুমের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে ছোট্ট একটি তাঁবু, যেখানে রাতের ভ্যাপসা গরমের মধ্যে সে, তার বাবা-মা এবং পাঁচ ভাইবোন গাদাগাদি করে থাকে।
এই মাসের নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আগে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের কারণে যে ৩২ লাখেরও বেশি শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—মুনির এখন তাদেরই একজন।
পড়াশোনা করা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু এমন এক পরিস্থিতিতে নয় যেখানে আমাদের খাবার, পানি এবং অন্যান্য মৌলিক জিনিস জোগাড় করতেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে। আপাতত যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কাজ চালিয়েই যাব বলে যোগ করে মিনর।
বাধ্য হয়েই ছেলেদের কাজে পাঠিয়েছেন জানিয়ে তার বাবা গালেব ফারি বলেছেন, ক্যাম্পে বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম খরচটুকু কোনোমতে জোগাড় করতে পারে। এই ক্যাম্পটি কেবলই একটি সাময়িক ঠিকানা এবং দ্রুতই নিজের গ্রামে ফিরে যেতে চাই। তবে প্রতিদিন নতুন নতুন বাস্তুচ্যুত মানুষকে ক্যাম্পে আসতে দেখে তিনি খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।
সংঘাতের ভয়াবহতা তুলে ধরে তাইজ শহরের ৫৬ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি ইসাম নাবিল বলেন, ‘সামরিক সংঘাত বৃদ্ধির মূল্য সাধারণ নাগরিকদেরই দিতে হয়, এবং মনে হচ্ছে তাইজে আমাদেরকেই এর বিশেষ চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে, কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এখন আর সহজে আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।’
সুত্রঃ কালেরকন্ঠ
