দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। দেশের বাইরের দুটো উগ্রপন্থী জঙ্গী-সংগঠন বোমা হামলা চালিয়ে ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানোর এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে বলে প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এই হামলার শিকার হতে পারেন প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা; বড় কোনো গণজমায়েত কিংবা অনুষ্ঠানেও এটি সংঘটিত হতে পারে।
একাধিকবার দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে এই হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তৎপর থাকতে এবং নজরদারি বাড়াতেও বলা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরে অতি সম্প্রতি এই জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নিয়ে বিশেষ সভাও হয়েছে। এতে বোমা হামলার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্র জানাচ্ছে, দেশে জঙ্গি নেই, উগ্রপন্থী নেই গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছে। সরকারের এই দুর্বল দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগেই মূলত মৌলবাদীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার কিংবা বর্ষবরণ কিং অন্য কোনো বড় সমাবেশ-অনুষ্ঠানকে বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু করে উগ্রপন্থীরা সংগঠিত হচ্ছেÑ শীর্ষ স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে টানা কয়েকবার এমন আশঙ্কাযুক্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানোর পর সংশ্লিষ্টরা বাধ্য হন নড়েচড়ে বসতে। গত কয়েক দিন আগে পুলিশ সদর দপ্তরে এ নিয়ে একটি জরুরি সভাও হয়। সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থাকে তৎপর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
Google News গুগল নিউজে প্রতিদিনের বাংলাদেশ”র খবর পড়তে ফলো করুন
সূত্রটি দাবি করছে, এ সভার পর দেশজুড়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর কারণে পহেলা বৈশাখে বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পায়নি বলে সূত্রটির দাবি। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা যেভাবে চলাফেরা করছেন, জনসমক্ষে যাচ্ছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেনÑ হামলাকারীরা এসব স্থানগুলোও টার্গেট করেছে।
সিটিটিসিকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে
পুলিশ সদর দপ্তরের সভাসূত্র জানাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ছাড়াও পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও এন্টি টেররিজম ইউনিটকে (এটিইউ) জঙ্গি ও উগ্রপন্থীদের পক্ষ থেকে বোমা হামলা চালানোর আশঙ্কার খবর বিশেষভাবে জানানো হয়েছে। সভায় পুলিশ প্রধানের কাছে হামলার আশঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরেন বিশেষ শাখার প্রধান। গত দেড় বছর ধরে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড টান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সংগঠনটি অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকার বিষয় নিয়েও সেখানে বিশেষ আলোচনা হয়। সভাসূত্র মতে, পুলিশপ্রধান এ সময় সিটিটিসিকে আগের মতো কার্যকর করার তাগিদ দেন। সভায় আইজিপি জঙ্গি ও উগ্রপন্থীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে দেশে জঙ্গি নেই, উগ্রপন্থী নেই বলে যে বয়ান তৈরি হয়েছে, তা সঠিক নয়।’
এ সভার আলোচনায় উঠে আসে, সিটিটিসিকে পরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। বিগত দিনে এই বিশেষায়িত সংস্থায় যারা কাজ করেছেন, তাদের প্রত্যেক সদস্যকেই গুম কমিশনের মাধ্যমে নানা মামলার আসামি করায় পুলিশের সদস্যরা এখন সিটিটিসিতে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। কারণ ভবিষ্যতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মামলার মুখোমুখি হওয়ার ভয় তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, জঙ্গি ও উগ্রপন্থী দমন অভিযানের নামে পুলিশ সদস্যরা অতীতে গণহারে নাটক করেছেনÑ এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সিটিটিসিকে নিয়ে আস্থার সংকটও তৈরি করা হয়েছে।
জঙ্গি জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে হামলার প্রস্তুতির খবর
শীর্ষ স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, দেশের বাইরের দুটো জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এজেন্টরা নানা সুযোগে বাংলাদেশে ঢুকছে। দেশের বাইরের উগ্রপন্থী জঙ্গিদের ওপর নজরদারি করতে গিয়ে শীর্ষস্থানীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা গত দুই সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে একজন জঙ্গিকে আটক করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য মেলে যে, এলইটি ও টিটিপি বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই জিজ্ঞাসাবাদ থেকে গোয়েন্দা সংস্থা বুঝতে পারে, গত দেড় বছর ধরে জঙ্গি না থাকার যে ‘বয়ান’ তৈরির চেষ্টা চলেছে, তা আসলে সঠিক নয়।
একনজরে এলইটি ও পিটিটি
লস্কর-ই-তাইয়েবা বা লস্কর-ই-তাইয়িবা দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত একটি সালাফি জিহাদবাদী ইসলামী সশস্ত্র সংগঠন। ১৯৯০ সালে হাফেজ মোহাম্মদ সাঈদ, আবদুল্লাহ ইউসুফ আযযাম ও জাফর ইকবাল আফগানিস্তানে লস্কর-ই-তৈয়বা প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরের কাছে মুরিদকে নামের জায়গায় এর সদর অবস্থিত। দলটি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে বিভিন্ন ক্যাম্প চালনা করে।
পাকিস্তানি চরমপন্থী এই গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত সংগঠন। লস্করের শাখা হিসেবে পরিচিত দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টকেও (টিআরএফ) যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটির বিরুদ্ধে ভারতের পাশাপাশি পশ্চিমেও বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাইতে তিন দিনের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা অন্যতম।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) একটি দেওবন্দি জিহাদি জঙ্গি গোষ্ঠী। তারা পাকিস্তানি তালেবান নামেও পরিচিত। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বাইতুল্লাহ মেহসুদের নেতৃত্বে পাকিস্তানের ফেডারেল শাসিত উপজাতি এলাকার (এফএটিএ) ১৩টি জঙ্গি গোষ্ঠীকে একত্র করে টিটিপি গঠিত হয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত।
বাংলাদেশে টিটিপির সাম্প্রতিক তৎপরতা
দুবাইয়ে যাওয়ার কথা বলে বাংলাদেশের মাদারীপুরের এক যুবক গিয়েছিলেন পাকিস্তানে। কিন্তু তিনি যোগ দেন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন টিটিপিতে। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ফয়সাল মোড়ল (২১) নামের সেই যুবক। এ ঘটনার পর বাংলাদেশে আবারও টিটিপির কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৭ এপ্রিলও উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বোমা হামলায় টিটিপির ৫৪ জন সদস্যের সঙ্গে আহমেদ জোবায়ের নামের এক বাংলাদেশি নিহত হয়। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে অন্তত চারজন বাংলাদেশি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার পর পাকিস্তানের টিটিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে অন্তত দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
ঢাকায় জঙ্গিবিষয়ক কাজে যুক্ত পুলিশের কিছু সূত্রমতে, টিটিপির জন্য বাংলাদেশ থেকে জনবল সংগ্রহ করার একটি প্রক্রিয়া অনেক দিন ধরেই সক্রিয় আছে। ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামের এক ব্যক্তি ওই সংগঠনের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাংলাদেশিদের উদ্বুদ্ধ ও সংঘবদ্ধ করে থাকেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশে টিটিপির সঙ্গে যুক্ত যারা আটক হয়েছে, তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের একটি সূত্র জানাচ্ছে, এখান থেকে সৌদি আরব কিংবা দুবাই হয়ে আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানে পৌঁছে টিটিপি নেটওয়ার্কের সদস্যরা। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে তাদের চ্যানেলে এ বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করে আসছিল। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই গত বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের পুলিশ টিটিপির সাথে সম্পৃক্ত সন্দেহে দুজনকে আটক করে বলে পুলিশের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে একজনকে গত বছরের ২ জুলাই ঢাকার কাছে সাভার থেকে এবং অন্যজনকে ১৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই টিটিপির সঙ্গে যোগসূত্র থাকার অভিযোগ আনা হয়।
চৌকস কর্মকর্তারা সিটিটিসিতে যুক্ত হতে চাইছেন না
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সন্ত্রাসবাদ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলায় গঠিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি বিশেষ শাখা। সিটিটিসি এফবিআইÑএর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথ সহযোগিতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত ও বর্তমানে বিলুপ্ত গুম কমিশন থেকে সিটিটিসিতে বিগত দিনে কাজ করা পুলিশ সদস্যদের গুম-খুন-অপহরণের মতো বিভিন্ন ঘটনায় জড়িয়ে মামলা দেওয়া হয়। বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে মামলা দেওয়ার সুপারিশও করা হয়। এমন পরিস্থিতি এড়াতে বর্তমানে ডিএমপির এই বিশেষায়িত ইউনিটে কোনো চৌকস ও অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা পদায়িত হতে চান না। এর ফলে বাংলাদেশে বিদেশি জঙ্গি সংস্থাগুলোর তৎপরতা অনুসন্ধানে ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সিটিটিসি ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে।
সুত্রঃ প্রতিদিনের বাংলাদেশ
