পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ইশতিয়াক আহম্মেদ সামীর পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর আগে, গত ৩১ মার্চ ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানি চরমপন্থি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার আট সদস্যকে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভারতীয় পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক। দুই মাস ধরে চালানো অভিযানে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা, কলকাতা, দিল্লি ও তামিলনাড়ু থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে প্রকাশিত সাত বাংলাদেশি হলো, বগুড়ার মিজানুর রহমান (৩২), জাহিদুল ইসলাম (৪০), মোহাম্মদ লিটন (৪০), মোহাম্মদ উজ্জ্বল (২৭) ও ওমর ফারুক (৩২), ঝালকাঠির মো. শাফায়েত হোসাইন (৩৪) এবং ঠাকুরগাঁওয়ের রবিউল ইসলাম (২৭)।
আবার সক্রিয় হচ্ছে জঙ্গি নেটওয়ার্ক?
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো এখন আর আগের মতো প্রকাশ্য সাংগঠনিক কাঠামোয় কাজ করছে না। বরং ছোট ছোট সেলভিত্তিক নেটওয়ার্কে কার্যক্রম পরিচালনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রধান কৌশলের মধ্যে রয়েছে, অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশন, ‘লোন উলফ’ বা একক হামলাকারী তৈরি, স্বল্প সক্ষমতার বিস্ফোরক বা গোপন অস্ত্র প্রস্তুত এবং এনক্রিপ্টেড বা গুপ্ত অ্যাপের মাধ্যমে গোপন যোগাযোগ।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জঙ্গিবাদ বর্তমানে দৃশ্যমান না থাকলেও ‘স্লিপার সেল’ ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও সতর্কতার প্রয়োজন
গত এক দশকে ধারাবাহিক আইনশৃঙ্খলা অভিযান জঙ্গি নেটওয়ার্ককে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। বিশেষ করে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর সাঁড়াশি অভিযানে একাধিক সংগঠনের সাংগঠনিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ সময় জঙ্গি তৎপরতা দৃশ্যত কমে আসে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ডিজিটাল র্যাডিক্যালাইজেশন। ভার্চুয়াল স্পেস এখন উগ্রবাদী নিয়োগ ও মতাদর্শ বিস্তারের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সূচনা নব্বইয়ের দশকে আফগান যুদ্ধফেরত কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে ঘটে। ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে শায়েখ আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) প্রতিষ্ঠিত হয়। সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাই ছিলেন তার প্রধান সহযোগী। ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে সংগঠনটি প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শন শুরু করে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলার প্রায় ৫০০ স্থানে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ইতিহাসে বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই হামলার দায় স্বীকার করে জেএমবি।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান
পুলিশ সদর দফতর থেকে দেওয়া চিঠি ও গ্রেফতার হওয়া এক ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী দুই সাবেক সেনা সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখনই এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একটি গ্রেফতার বা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে বড় ধরনের উপসংহার টানা ঝুঁকিপূর্ণ। তদন্ত এগোলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। মিডিয়া ও সাধারণ মানুষ সবারই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বা পরিবর্তনের সময় অনেক ধরনের তথ্য বা বিশ্লেষণ সামনে আসে। কিছু ক্ষেত্রে হাইপার টেনশন বা উদ্বেগ তৈরির চেষ্টা থাকতে পারে। কিন্তু যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনও কিছুই বলা উচিত নয়।
সাবেক সেনা সদস্যদের নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে কোনও এক্সট্রিমিস্ট সংস্কৃতি নেই। বাহিনীর নিজস্ব পেশাদার কাঠামো ও শৃঙ্খলা অত্যন্ত শক্তিশালী। সশস্ত্র বাহিনী জাতি, ধর্ম বা মতাদর্শ নির্বিশেষে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দেয়। তাই এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের কিছু গণমাধ্যম বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে। তবে আমাদের উচিত নিজস্ব তথ্য যাচাই করে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা। ভেতরের বা বাইরের প্রচারণা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
পুলিশের চিঠি ইস্যু নিয়ে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্কতা জারি করে মূলত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে। এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। সতর্কতা মানেই বড় ধরনের হামলা আসন্ন- এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি দেখছে।
সুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন
