২০২১ সালের আগস্টে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর থেকে তালেবানদের ডি ফ্যাক্টো কর্তৃপক্ষ (ডিএফএ) নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার কেড়ে নিতে একের পর এক নির্দেশনা জারি করেছে—শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাচলের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে জনজীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার পর্যন্ত।
বর্তমানে আফগানিস্তানে মেয়েরা মাধ্যমিক শিক্ষায় যেতে পারে না। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিষিদ্ধ। অধিকাংশ চাকরি, এমনকি পার্ক, জিম ও ক্রীড়াকেন্দ্রের মতো জনসমাগমস্থলেও তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
এর পাশাপাশি চলমান মানবিক সংকট ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি সবার জীবনই কঠিন করে তুলেছে, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও কন্যাশিশুরা।
কিন্তু বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের নয়। জাতিসংঘ নারী সংস্থার ২০২৪ সালের ‘আফগানিস্তান জেন্ডার ইনডেক্স’ দেখাচ্ছে, নারীর অধিকার সংকট যত গভীর হচ্ছে, তত দ্রুত আফগানিস্তানের সামগ্রিক অবনমন ঘটছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
নিচে তথ্যের আলোকে তুলে ধরা হলো পরিস্থিতির চিত্র এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ।
আফগান নারীরা কি স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন?
আফগান নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ভয়, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষাব্যবস্থার ধস এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য নারী ও কন্যাশিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে।
অনেক নারী ভয়ের কারণে ঘর থেকেই বের হতে পারেন না। যারা বের হন, তাদের অনেক সময় মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ক্লিনিকে যেতে হয়, কিন্তু সেখানে গিয়ে কেবল নারী হওয়ার কারণেই চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে আসতে হয়।
কিছু প্রদেশে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নারী রোগীর চিকিৎসা নিষিদ্ধ। অথচ নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও ক্রমেই কমছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তালেবান কর্তৃপক্ষ নারীদের মেডিসিন ও ধাত্রীবিদ্যা পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ফলে নারী চিকিৎসক হওয়ার শেষ সুযোগটিও বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলাফল ভয়াবহ। নারীরা আগের তুলনায় কম সুস্থ ও কম আয়ু নিয়ে বেঁচে আছেন। মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষ করে বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মাতৃত্বের হার বেড়ে যাওয়ায়। অধিকাংশ নারী নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন না, সে দায়িত্ব চলে গেছে পুরুষ আত্মীয়দের হাতে।
ঘরে বন্দি থাকার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। শারীরিক ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক সহায়তার অভাবে নারী ও কন্যাশিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও নিরাশা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের নারীদের মতোই আফগান নারীরাও অর্থনৈতিক সংকটে নিজের স্বাস্থ্যের চেয়ে সন্তান ও পরিবারের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
আফগানিস্তানে মেয়েরা কেন স্কুলে যেতে পারে না?
ষষ্ঠ শ্রেণির শেষ দিনে স্কুলের গেট দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ আফগান কন্যাশিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হয়ে যায়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তালেবান মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
তবে সংকট শুরু হয় আরও আগে। দারিদ্র্য, কড়া লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক রীতি ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ আফগান মেয়ে কখনোই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবার ছেলে-মেয়ে উভয়কেই স্কুল থেকে নিয়ে আয় রোজগারে নামায় বা বাল্যবিবাহের প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হয়, যার হার দিন দিন বাড়ছে।
কিছু অনানুষ্ঠানিক বা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম থাকলেও তা খুব অল্পসংখ্যক মেয়ের কাছে পৌঁছায় এবং কখনোই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার বিকল্প নয়। এসব পথ উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সুযোগও তৈরি করে না।
এর প্রভাব মারাত্মক—
৭৮ শতাংশ তরুণ আফগান নারী শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন, যা তরুণ পুরুষদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। ২০২৬ সালের মধ্যে কিশোরী মাতৃত্ব ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মাতৃমৃত্যুর হার ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ রাখার ফলে আফগানিস্তান প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারাচ্ছে।
এটি কেবল স্কুল বন্ধ থাকার গল্প নয়, এটি হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ, জীবিকা ও দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়া সমাজের গল্প।
আফগান নারীরা কি কাজ করতে পারেন?
বর্তমানে আফগানিস্তানে বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রমবাজারভিত্তিক লিঙ্গ বৈষম্য বিদ্যমান। ২৫ শতাংশ নারী কাজ করছেন বা কাজ খুঁজছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ।
এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। তালেবানরা সরকারি চাকরি, দেশি-বিদেশি এনজিও এবং বিউটি সেলুনের মতো খাতে নারীদের কাজ নিষিদ্ধ করেছে, যেগুলো একসময় নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল।
যেসব নারী কাজ করছেন, তাদের বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে কম আয়ের ও অনিশ্চিত কাজে বাধ্য হচ্ছেন। আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকারও সীমিত, ৭ শতাংশেরও কম আফগান নারীর ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল মানি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
নারী নেতৃত্বাধীন নাগরিক সংগঠনগুলোও চরম চাপে পড়েছে। তালেবানরা নারী এনজিওকর্মীদের নিষিদ্ধ করেছে, নেতৃত্ব থেকে নারীদের সরিয়ে দিয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প নথিতে ‘নারী’ শব্দের বদলে ‘পুরুষ’ শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে। ফলে বহু নারী সংগঠন বন্ধ হয়ে গেছে বা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে কমিয়ে এনেছে।
আফগানিস্তানে নারীরা কি রাজনীতিতে অংশ নিতে পারেন?
বর্তমানে আফগানিস্তানের আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে নারীদের কোনো স্থান নেই। ২০২০ সালে যেখানে সংসদের ২৫ শতাংশের বেশি আসনে নারী ছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন, সেখানে এখন তালেবান মন্ত্রিসভায় একজন নারীও নেই।
কিছু নারী অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজেদের কমিউনিটি ও সংগঠনের পক্ষে কথা বলছেন। তবে এটি সমান প্রতিনিধিত্বের বিকল্প নয়।
রাষ্ট্রের কোথাও নারী নেতৃত্বের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই, না টেলিভিশনে, না সরকারি অনুষ্ঠানে। মেয়েদের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট: নেতৃত্ব তোমাদের জন্য নয়।
এমনকি পারিবারিক পরিসরেও নারীদের প্রভাব কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘ নারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিজেদের পরিবারে সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখার সক্ষমতা আছে বলে মনে করেন, এমন নারীর সংখ্যা ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
আফগানিস্তানে নারী হওয়া কি নিরাপদ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না এবং ঝুঁকি বাড়ছেই।
সারাদেশে নির্ভরযোগ্যভাবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ এখন আর সম্ভব নয়। তবে বিদ্যমান তথ্য ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ২০১৮ সালে প্রতি তিনজন আফগান নারীর মধ্যে একজন গত এক বছরে স্বামী বা সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন।
২০২১ সালের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা এবং সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের আইন ও সেবা ভেঙে পড়ায় সহিংসতা বেড়ে চলেছে।
চলাচলের নিষেধাজ্ঞা নারীদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অনেক এলাকায় নারীদের ঘরের বাইরে যেতে হলে পুরুষ অভিভাবক সঙ্গে থাকতে হয়, এমনকি অল্প দূরত্বের জন্যও। বিধবা বা পুরুষ আত্মীয়হীন নারীদের খাদ্য বা চিকিৎসার জন্য বের হওয়াটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
বাল্যবিবাহ, জোরপূর্বক ও অল্প বয়সে বিয়ের হারও বাড়ছে। ২০২৩ সালে ১৮ বছরের নিচে প্রায় ৩০ শতাংশ আফগান মেয়ের বিয়ে হয়েছে, যার মধ্যে ১০ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরেরও কম। দারিদ্র্যের চাপে অনেক পরিবার এটিকে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
তবুও কি নারীদের কোনো প্রভাব আছে?
চরম বিধিনিষেধের মধ্যেও আফগান নারী ও কন্যাশিশুরা পথ খুঁজে নিচ্ছেন।
তারা এখনো ব্যবসা চালাচ্ছেন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে কাজ করছেন, সাংবাদিকতা করছেন এবং কমিউনিটি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সব বাধা সত্ত্বেও তারা নিজেদের এবং সব আফগানের অধিকার নিয়ে কথা বলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সুত্রঃ দ্যা ডেইলি ষ্টার
