মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য কলিমুদ্দিন কালু ওরফে কালুকে প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণের মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে তাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মেহেরপুর জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ আলী মাসুদ শেখ রবিবার দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় সাজাপ্রাপ্ত ইউপি সদস্য হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাকে মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সাজাপ্রাপ্ত কলিমুদ্দিন কালু মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের আব্দুল মন্ডলের ছেলে। তিনি পিরোজপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে পিরোজপুর গ্রামের এক বাসিন্দার প্রতিবন্ধী স্ত্রী রাতের খাবার খেয়ে ঘরে মশারি টানাচ্ছিলেন। এ সময় ইউপি সদস্য কলিমুদ্দিন কালু ওই ঘরে প্রবেশ করে ধর্ষণ করেন।
ওই নারীর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্ত কালু পালিয়ে যান। পালিয়ে যাওয়ার সময় বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য তিনি হুমকি দেন বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পরে ভুক্তভোগী নারীর মা বাদী হয়ে মেহেরপুর সদর থানায় মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২২ এবং নারী ও শিশু মামলা নম্বর ১০২/২০২৪।
তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। মামলায় মোট সাতজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আসামির ওপর আরোপিত অর্থদণ্ড ভিকটিমের ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। আসামির বর্তমান সম্পদ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে তার মালিকানাধীন বা অধিকারভুক্ত সম্পদ থেকে তা আদায় করা যাবে এবং অন্যান্য দাবির তুলনায় ক্ষতিপূরণের দাবি অগ্রাধিকার পাবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৬ ধারার বিধান অনুযায়ী আসামির স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ নিলামে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার জন্য ডেপুটি কালেক্টর, মেহেরপুরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে ওই অর্থ ভিকটিমকে প্রদান করা হবে।
রায় ঘোষণার পর কলিমুদ্দিন কালুকে হাতকড়া পরিয়ে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় তিনি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় তাকে আদালতের একটি বেঞ্চে শুইয়ে মাথায় পানি দেওয়া হয়। বেশ কিছুক্ষণ পরও জ্ঞান না ফেরায় পুলিশ পিকআপে করে তাকে মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মেহেরপুর জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুস্তাফিজুর রহমান তুহিন (তুহিন অরণ্য) রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামি কলিমুদ্দিন কালু দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আদালত তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুস্তাফিজুর রহমান তুহিন এবং আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট ইব্রাহীম শাহীন আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিল করতে চাইলে আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন।
মামলাই রাষ্ট্রপক্ষের উকিল মেহেরপুর জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন (তুহিন অরন্য) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ভুক্তভোগী একজন প্রতিবন্ধী নারী হওয়ায় ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও মানবিকভাবে স্পর্শকাতর। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা আশা করি, এই রায় সমাজে অপরাধীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।”
সুত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
